বিচারক হিসেবে অত্যন্ত সৎ ও সুনামের অধিকারী ছিলেন নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা জজ কাজী আবদুল হাসিব মো. আবু সাঈদ। কিন্তু চট্টগ্রামে অপরাধ জগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। অনেকটা বাধ্য হয়েই করতে হয়েছে দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথম স্ত্রীর অজান্তে দ্বিতীয় বিয়ে করাটাই কাল হয়ে দেখা দিয়েছে এই বিচারকের জীবনে। অর্থলিপ্সু, মাদকসেবী ও ইয়াবা ব্যবসায়ী দ্বিতীয় স্ত্রী ও তার স্বজনদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হলো বিচারক আবু সাঈদকে (৪৭)। উল্লেখ্য, গত ১৬ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার চট্টগ্রাম মহানগরীর হালিশহরের মোল্লাপাড়ার একটি ফ্ল্যাট বাসায় নওগাঁ জেলার অতিরিক্ত জেলা জজ আবদুল হাসিব সাঈদের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে সাঈদের দ্বিতীয় স্ত্রী সানজিদা আক্তার মিশু, তার সৎভাই ইমরান এবং তার মা লাকি আক্তারকে সঙ্গে নিয়ে সাঈদকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আবু সাঈদ আত্মহত্যা করেছেন বলে তার দ্বিতীয় স্ত্রী মিশু ও শাশুড়ি লাকি আক্তার দাবি করলেও ঘটনাটি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় হাসপাতাল চত্বরেই মিশু, তার সৎভাই ইমরান এবং মাকে পুলিশ গ্রেফতার করে। পরদিন নগরীর হালিশহর থানায় এই তিনজন ও মিশুর গৃহকর্মী এবং শ্বশুর নাসির আহাম্মদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে পুলিশ। মামলার পর থেকেই পলাতক রয়েছে বিচারকের শ্বশুর নাসির আহাম্মেদ। মামলার এক দিন পর তিন আসামিকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, বিচারক আবু সাঈদ দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। চট্টগ্রামে সিনিয়র মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। ভারপ্রাপ্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিট্রেটের দায়িত্বও পালন করেন কিছুদিন। পরে তিনি যুগ্ম জেলা জজ হিসেবে চট্টগ্রামের পটিয়া আদালতে কর্মরত ছিলেন। পটিয়া থেকে তাকে নওগাঁ জেলায় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে বদলি করা হয়। চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে একটি হত্যা মামলার সূত্র ধরে অপরাধ জগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৯ বছর বয়সী তরুণী সানজিদা আক্তার মিশু ও তার মা লাকি আক্তারের সঙ্গে পরিচিত হন। এ পর্যায়ে বিচারক মিশুর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন এবং মিশুদের বাসায় তার যাতায়াত শুরু হয়। বাড়ে ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু মিশু, তার পিতা-মাতা, ভাই ও অন্যরা ইয়াবা ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত— এই বিষয়টি আবু সাঈদের কাছে অজ্ঞাতই ছিল।
মিশুদের পরিবারের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, বাসায় যাতায়াত ও ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে মিশু ও তার মা-বাবা বিচারককে অনেকটা ফাঁদে ফেলে গত জুন মাসে মিশুকে বিয়ে করতে বাধ্য করেন। বিচারক আবু সাঈদ প্রথম স্ত্রী ও অবুঝ দুই সন্তানের অজ্ঞাতে মাত্র তিন মাস আগে সানজিদা আক্তার মিশুকে বিয়ে করতে বাধ্য হন। বিয়ে করার পর তিনি নওগাঁ জেলায় বদলি হয়ে যান। এরপর তিনি প্রায়ই নওগাঁ থেকে চট্টগ্রাম এসে নিজের ভাড়া করা ফ্ল্যাটে মিশু ও তার পরিবারের সঙ্গে মিলিত হতেন। বিয়ের পর আবু সাঈদের কাছ থেকে অর্থ ও সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার নানা আয়োজন করেন মিশু ও তার মা-বাবা।
মিশুদের পরিবারের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, বাসায় যাতায়াত ও ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে মিশু ও তার মা-বাবা বিচারককে অনেকটা ফাঁদে ফেলে গত জুন মাসে মিশুকে বিয়ে করতে বাধ্য করেন। বিচারক আবু সাঈদ প্রথম স্ত্রী ও অবুঝ দুই সন্তানের অজ্ঞাতে মাত্র তিন মাস আগে সানজিদা আক্তার মিশুকে বিয়ে করতে বাধ্য হন। বিয়ে করার পর তিনি নওগাঁ জেলায় বদলি হয়ে যান। এরপর তিনি প্রায়ই নওগাঁ থেকে চট্টগ্রাম এসে নিজের ভাড়া করা ফ্ল্যাটে মিশু ও তার পরিবারের সঙ্গে মিলিত হতেন। বিয়ের পর আবু সাঈদের কাছ থেকে অর্থ ও সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার নানা আয়োজন করেন মিশু ও তার মা-বাবা।
বিচারকের দ্বিতীয় স্ত্রী মিশু লাকি আক্তারের দ্বিতীয় ঘরের সন্তান বলে পুলিশ জানায়। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, বিচারক আবু সাঈদ মিশুদের পরিবারকে যে ফ্ল্যাটটি ভাড়া করে দিয়েছিলেন, বিচারকের অনুপস্থিতিতে ওই ফ্ল্যাটে অজ্ঞাত একাধিক ব্যক্তির যাতায়াত ছিল। এখানে মাঝে মাঝে মদ ও ইয়াবা সেবনের আসর বসত। সিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (পশ্চিম) এস এম তানভির আরাফাত এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিচারক আবু সাঈদের মৃত্যুর বিষয়ে আমরা এখনো স্থির কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারিনি। রিমান্ডে এখনো আসামিরা এ ঘটনাকে “আত্মহত্যা” বলে যাচ্ছেন। তারা প্রকৃত ঘটনা স্বীকার করছেন না বলেই আমাদের কাছে মনে হচ্ছে।’ পুলিশ জানায়, রিমান্ডে মিশু জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন প্রথম স্ত্রী ও দুই সন্তানকে ত্যাগ করতে বেশ কিছুদিন ধরে তারা বিচারকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছিলেন। বিচারকের শাশুড়ি লাকি আক্তার বিচারককে হত্যা প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন মিশুর সঙ্গে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে কাপড় কাটার কাঁচি দিয়ে নিজের মাথায় নিজেই আঘাত করেন বিচারক আবু সাঈদ। একপর্যায়ে তিনি কক্ষের ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে কক্ষে ঢোকেন মা-মেয়ে। এ সময় তারা আবু সাঈদকে গলায় ফাঁস লাগানো দেখতে পান। পরে তারা আবু সাঈদকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন।লাকি আক্তারের এই বক্তব্য পুলিশের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা। তবে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচারক আবু সাঈদের হত্যারহস্য পুরোপুরি উন্মোচন করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার তানভির আরাফাত।
This news on Rising BD to see click here